‘ভয়ঙ্কর’ জঙ্গল সলিমপুর এখন নিয়ন্ত্রণে

আপলোড সময় : ১৫-০৩-২০২৬ ১২:৩২:০৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-০৩-২০২৬ ১২:৩২:০৩ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
মাসখানেক আগেও আতঙ্ক ও ভীতির জনপদ ছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর। জঙ্গলের প্রবেশপথে সশস্ত্র পাহারায় থাকতো থাকত সন্ত্রাসীরা। পাহাড়ঘেরা এ এলাকায় ঢুকতে গেলে দেখাতে হতো ‘বিশেষ পরিচয়পত্র’। এমনকি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ভেতরে যেতে পারতেন না। অভিযান চালাতে গিয়ে তাঁরা হামলার শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন। সেই ‘ভয়ঙ্কর’ জঙ্গল এখন পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে।

গত ২ মার্চ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। প্রথমবারের মতো একটি বড় অভিযান রক্তপাত ছাড়াই শেষ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হামলার মুখেও পড়েননি। আগেই পালিয়ে যায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। অভিযানের পর পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় যৌথ বাহিনী। ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প। নিয়মিত টহল চলছে। সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য আনাগোনা নেই। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে এলাকায় যাতায়াত করছেন। গত শুক্রবার জঙ্গল সলিমপুর ঘুরে পরিবর্তনের এই চিত্র দেখা গেছে।

তবে এই বদল শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির নয়। পেছনে আছে পাহাড় কেটে বসতি গড়া, সরকারি খাসজমি দখল, কোটি কোটি টাকার প্লট–বাণিজ্য, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা দখলদার গোষ্ঠী এবং থমকে থাকা সরকারি প্রকল্পের দীর্ঘ ইতিহাস। কয়েক দশক ধরে ৩ হাজার ১০০ একরের যে এলাকাটি দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যৌথ অভিযানের পর সেখানে প্রথমবারের মতো দৃশ্যমানভাবে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এরপর বেদখলে থাকা জমিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কাজ শুরু হবে। এলাকাটিতে বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে ইতিমধ্যে ২৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জমি, পরিবেশ ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে সুপারিশ দেবে কমিটি।

পাহাড়ঘেরা এলাকাটি প্রায় ২৫/২৬ বছর ধরে সন্ত্রাসীদের দখলে। এই সময়ে বার বার সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধের মুখে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফিরে আসতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় র‍্যাবের অভিযানে সন্ত্রাসীদের হামলায় একজন র‍্যাব সদস্য নিহত হন।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক ঢুকে গেছে পাহাড়ের ভেতরে। সেই পথেই শুরু জঙ্গল সলিমপুর। গত শুক্রবার সকালে সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা এক মাস আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। পাহাড় কেটে বানানো সরু ও প্রশস্ত পথ ধরে লোকজন অবাধে চলাফেরা করছেন। দোকানপাট খোলা। বাজারে মানুষের ভিড়। রাস্তার ধারে শিশুরা খেলছে। কোথাও কোথাও পুলিশের দল টহল দিচ্ছে।

প্রশস্ত সড়ক ধরে কিছুটা এগোলেই ডান পাশে একটি মাজার। তারপর এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়সংলগ্ন বাজার ও বিপণিবিতানে বেশ ভিড়। মাছ, মাংস, শাকসবজি, নিত্যপণ্যের দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা দেখে মনে হয়, দীর্ঘদিনের ভয়ের পর মানুষ যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছেন।

কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ‘আগের চেয়ে ভালো আছি। এভাবে থাকতে পারলেই হয়।’ বললেন, আগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মারামারি হতো। বাইরে থেকে অস্ত্রধারীরা আসত। রাতের পর রাত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হতো। এখন অন্তত সেই ভয়টা কমেছে। পুলিশি পাহারা আছে, সন্ত্রাসীদের দেখা যাচ্ছে না।’

তারা বলেন, ‘এখানে বারবার আধিপত্যের পালাবদল হয়েছে। গোষ্ঠী বদলেছে। এখন যেটুকু শান্তি এসেছে, সেটি যেন বজায় থাকে।’

এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ভেতরে বসেছে পুলিশের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প। এখানে প্রায় ১৩০ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। আরেক অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছে আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়। এখানে প্রায় ২৩০ জন র‌্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য রয়েছেন।

টহলরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বললেন, এখন দৃশ্যমান কোনো সন্ত্রাসী নেই। লোকজনও পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। স্বস্তি বজায় রাখতে পুলিশের নিয়মিত টহল থাকবে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাস ছিল এই বিশাল অংশে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং আমরা সেটি করতে পেরেছি। পুলিশ ও র‍্যাবের দুটি ক্যাম্প এখানে কাজ করছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা বিধানে যদি এখানে কামান দেওয়া লাগে, আমরা কামান দেব।’

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের এই নতুন আশাবাদের মধ্যেও জঙ্গল সলিমপুরের নিরাপত্তার প্রশ্নটি জটিলই থেকে যাচ্ছে। এখানে কয়েক দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতি ও হাজারো পরিবারের পুনর্বাসনের প্রশ্ন এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ অবশেষে প্রশাসনের হাতে এসেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি জায়গা যাতে আর কোনো অবস্থায় বেহাত না হয়, সে জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিকল্পিত সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু করা উচিত। প্রয়োজনে এলাকাটি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানেও রাখা যেতে পারে।
 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ গোলাম মাওলা শাওন


অফিস :

অফিস :  দৈনিক অন্বেষণ ৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্সে ১০ম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০।

ইমেইল : dailyanneshonnews@gmail.com

মোবাইল : 01711006153