নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত লুটেরা সিন্ডিকেটের থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌচ্ছেনা। বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর যে সিন্ডিকেট স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংস করেছে। বহুল আলোচিত সেই সিন্ডিকেট আরও ভয়ংকর রূপে স্বাস্থ্যখাত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। অভিযোগ উঠেছে সিন্ডিকেট বাণিজ্যে ঠিকাদার, ড্যাব, স্বাচিপ’র একটি সুবিধাবাদি চক্র বরাবরে মতই সক্রিয় রয়েছে। কতিপয় প্রভাবশালী স্বাচিপ সদস্যদের মাধ্যমে বিগত সরকারের ১৭ বছর ড্যাবের সুবিধাবাদী চক্র ফায়দা নিয়েছে। এখন ড্যাবের সেই সুবিধাবাদি চক্র স্বাচিপের প্রভাবশালী সদস্যদের প্রতিদান দিচ্ছেন। তাদের স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। ১৭ বছরে সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী ঠিকাদার চক্র অঢেল অর্থের জোগান দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার ফেরার খবরে তারা আরও বেশি সক্রিয় ও উজ্জীবিত হয়েছেন। বিএনপি সরকার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে অচিরেই স্বাস্থ্যখাত ভেঙে পরার আশঙ্কা করছেন বিশষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত সিন্ডিকেটের দৌরাত্মে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর বৈশ্বিক মানদন্ডে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ছিল। ল্যানসেট হেলথ কেয়ার অ্যাক্সেস অ্যান্ড কোয়ালটি (HAQ) ইনডেক্স স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও সেবা প্রাপ্যতার মানদন্ড নির্ধারণে কাজ করে। ২০২৬ সালে তাদের গবেষণা সূচকে, বিশ্বের ১৯৫ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। অপরদিকে ‘গ্লোবাল হেলথ কেয়ার ইনডেক্স ২০২৬’ এর মূল্যায়িত ১০১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণের সিন্ডিকেট দৌরাত্ম ফিরে আসায় স্বাস্থ্যখাত চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সিন্ডিকেট ধারা থেকে বেরোতে না পারলে স্বাস্থ্যখাতে সরকার কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জে পরতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেই সিন্ডিকেট এই সিন্ডিকেট
সিন্ডিকেট ধাপে ধাপে কাজ করে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে হচ্ছে মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীক। মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঠিকাদার সিন্ডিকেটের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এদের সহযোগী হিসাবে চিকিৎসক ও কর্মচারিরা কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে
আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী-সচিব-চিকিৎসক ও ঠিকাদার যোগসাজশ করে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। তাদের সহযোগী হিসাবে তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণীর কতিপয় কর্মচারি ছিলো। সেই চক্র দৌর্দন্ড প্রতাপে ফের সক্রিয় হয়েছেন। শুধুমাত্র রাজনীতিতে পরিবর্তন হয়েছে। অন্য সব ক্ষেত্রে পুরোনোরা অধিকাংশই বহাল তবিয়তে ফিরছেন। অনেকে ফেরার পথে রয়েছেন। স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন কার্যক্রম এবং অপারেশনাল প্ল্যানের(ওপি) অধিনে বিপুল অংকের অর্থ বরাদ্দই ছিলো দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের লুটপাটের কেন্দ্র। কিন্তু ওপি বাতিল হওয়ার পর গত দুইবছর এ ধরনের ব্যপক ভিত্তিক উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। ফলে ঠিকাদাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাসপাতালের এমএসআর সামগ্রী কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম অপকর্মে নেমেছে।
স্বাস্থ্যখাতে লুটপাটের সবচেয়ে আলোচিত নাম মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। দেশের প্রতিটি মানুষই তা জানে। মিঠুর বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি বেশ কয়েকমাস কারাগারে ছিলেন।
সেই মিঠু সিন্ডিকেটের অন্যতম রবিউল ও এমদাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে এমএসআর ব্যবসা। তাছাড়া মাদারীপুরের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মিরাজ হোসেনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও বহাল তবিয়তে ওই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। হাতেগোনা কয়েকজন ঠিকাদারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্বাস্থ্যখাত। এদের প্রত্যেকের রয়েছে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদার চক্রের সদস্যরা সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। আগে থেকেই টেন্ডারের প্রকিউরিং এনটিটি (পিই)র পাসওয়ার্ড নিজেদের কাছে নেন। এতে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অন্য কারো কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিজেদের খেয়ালখুশিমত কাজ বাগিয়ে নেয়।
সিন্ডিকেটে চিকিৎসকদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছর স্বাচিপের প্রভাবশালি সদস্য ডা. নাঈম ইসলাম ঢাকা মেডিকেলে, ডা. মামুনুর রশীদ সোহরাওয়ার্দীতে ও ডা. তানভির রয়েছে ক্যান্সার হাসপাতালে। এদের পদায়নের ক্ষেত্রে ড্যাবের বিগত ১৭ বছর সুবিধাভোগী একাধিক চিকিৎসক রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. ফোয়ারা তাসমীম পামি এদের মধ্যে অন্যতম বলে জানা গেছে। প্রফেসর পামি বিগত সরকারের ১৭ বছর মন্ত্রণালয় সিন্ডিকেট ও স্বাচিপ সদস্যদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসে স্বাস্থ্যখাতে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে জানা গেছে। চিকিৎসকদের বদলী ও পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ডা. ফোয়ারা তাসনিম পামির বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতিরও নজির রয়েছে। তার প্রভাবেই বোন প্রফেসর ডা. বিদৌরা তানিম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজী বিভাগে প্রধান হয়েছেন বলে ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা দাবি করেছেন। প্রফেসর ডা. ফোয়ারা তাসমীম পামি স্বাচিপের কয়েকজন সদস্যের পদায়নের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এতে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের সংগঠনের অভ্যন্তরীন গ্রুপিংয়ের কারণে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।