গণপূর্তে টেন্ডার-বদলি বাণিজ্যের জাল, দুদকের অনুসন্ধানে বিস্ফোরক তথ্য
আপলোড সময় :
২৫-০৪-২০২৬ ১০:৩৮:৫২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৫-০৪-২০২৬ ১০:৩৮:৫২ অপরাহ্ন
গণপূর্তে টেন্ডার-বদলি বাণিজ্যের জাল, দুদকের অনুসন্ধানে বিস্ফোরক তথ্য
গণপূর্তে টেন্ডার-বদলি বাণিজ্যের জাল, দুদকের অনুসন্ধানে বিস্ফোরক তথ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা অনিয়ম, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত মিলেছে, যাদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠে আসছে বলে জানা গেছে।
একাদিক ঠিকাদারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ বদরুল আলম তিনি নিজেকে ধার্মিক ও পরহেজগার ব্যক্তি হিসেবে সবাইকে বুঝান, সে আসলে মুখোশধারী ঘুষখোর। বরিশালে উপ-প্রকৌশলী, ভোলা, ঝালকাঠিতে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন সময় তার কমিশন ও ঘুষ ছাড়া কোনো ধরনের স্বাক্ষর সে করে নাই।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অধিদপ্তরের একাধিক অসাধু কর্মকর্তা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মে জড়িত। কাজ সম্পূর্ণ না করেই বিল তোলা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং জাল নথি দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের মতো অভিযোগ সামনে এসেছে। পাশাপাশি টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপে-যেমন কার্যাদেশ দেওয়া, বিল অনুমোদন কিংবা জামানত ফেরত-অনিয়মিত আর্থিক লেনদেন একটি প্রচলিত চর্চায় পরিণত হয়েছিল। এমনকি আত্মীয়-স্বজনের নামে লাইসেন্স নিয়ে কাজ বণ্টনের অভিযোগও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
দুদকের অনুসন্ধানে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন প্রকৌশলীর বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ‘ভেরিয়েশন’ সুবিধার অপব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের তথ্যও পর্যালোচনা করছে দুদক।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে বদরুল আলমের স্ত্রী, যিনি নিজেও শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা তার পরিচয় গোপন করে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট কার্যক্রম, গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট, বসুন্ধরায় তিনটি প্লট, কোটি কোটি টাকার এফডিআর এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি লাইসেন্স রয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বদরুল আলম খান একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাপ, হুমকি, এমনকি অফিস ঘেরাওয়ের পরিকল্পনার অভিযোগও রয়েছে। নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং সাইট পরিদর্শনে গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে।
সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রকৌশলীরা ঢাকা সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ বদরুল আলমের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ঠিকাদার গ্রুপ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকার কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রুপকে কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেছেন, একটি মহল তাকে সরাতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির নামে হয়রানি ও কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
হঠাৎ বদলি, মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ গত ৩ মার্চ একদিনে অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীকে বদলির ঘটনায় তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই এই বদলি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করে এবং বিতর্কিত বদলির আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেয়।
২৩শে এপ্রিল ২০২৬ এর নম্বর: ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৪.২৪-৫৮৩ এর প্রজ্ঞাপনে ৭জনকে পদায়ন করা হয়েছে এবং এর ৭নং জনাব পিন্টু তালুকদার সহকারী প্রকৌশলীকে পটুয়াখালী থেকে তার নিজ এলাকা ভোলাতে পদায়ন করা হয়েছে। এই বদলির বিষয় পিন্টু তালুকদারকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ আমাকে বলেছেন তুমি আমার এলাকায় আসো আমি তোমাকে বদলি করে আনবো। স্পিকারের কথায় আমার এলাকায় বদলি করা হয়েছে। এই বিষয় সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ সারওয়ার জাহান এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে স্পিকারের পক্ষ থেকে কোন সুপারিশ আসেনি এবং পিন্টু তালুকদার এর বক্তব্য সঠিক নয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পিন্টু তালুকদারকে আমি চিনিনা, যাকে চিনিনা তার বদলির সুপারিশ কিভাবে করবো। আমি কোনো সুপারিশ করি না।
সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ সারওয়ার জাহান বলেন, মন্ত্রীদের নির্দেশেই বদলির আদেশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সচিবের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো ফাইল অগ্রসর করা হবে না।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর এর কাছে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ সারওয়ার জাহান এর বক্তব্যের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বদলির বিষয় আমি কিছুই জানিনা। যে বলছে তার নাম পদবি নাম্বার দিন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, মন্ত্রীর নির্দেশেই বিতর্কিত বদলির আদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং পরবর্তী কার্যক্রম নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার, পাল্টা ‘অপপ্রচার’ দাবি অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা তা অস্বীকার করে বলেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন নজর দুদকের অনুসন্ধানের দিকে-এই তদন্ত আদৌ সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই দেখার বিষয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর প্রকৌশলীদের তথ্য নিয়ে ২য় পর্বে আসছে ভিডিও নিউজ...
নিউজটি আপডেট করেছেন : NewsUpload
কমেন্ট বক্স